যুগকে তো এড়ানো যায় না। হয়তো ভবিষ্যতের কথা বলা যায়, কিন্তু যুগের ওপর নির্ভর করেই তো বলতে হয়: রফিক আজাদ

razad

রফিক আজাদ-এর আনেক পরিচয়। মূলত তিনি কবি। তাঁকে আর নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেবার অবকাশ নেই। তাঁকে সাক্ষাৎকারের কথা বলতেই বলেন, ‘সাক্ষাৎকার দিতে পারবো বলে আমার মনে হয় না। এখন নাম ভুলে যাই। বাচ্চাকাচ্চার নাম ভুলে যাই। বাঁচারও সম্ভাবনা নাই। কাজেই সুরা পান বন্ধ করতে হবে। এখন ঐটাও আরেকটা কারণ। এর মধ্যে শরীরটা আরও খারাপ হয়ে গেছে। ক্ষুধা নাই, তৃষ্ণা নাই। অনেকদিন আগে হলেও কথাবার্তা বলতে পারতাম।’

তাঁর সাথে কথা বলে সাক্ষাৎকার নিযেছেন: কবি চন্দন চৌধুরী

সর্বশেষ কবে কবিতা লিখেছিলেন মনে আছে?
মনে নাই। কিছু মনে নাই। বাচ্চাদের নাম ভুলে গেছি। দুই মাস আগে হলে কথা বলতে পারতাম। যেখানে যেটা পাও পড়ে নিও। অনেক সাক্ষাৎকার দিয়েছি। লেখাও আছে, অনেকের আছে। শামীম রেজার একটা বড় লেখা ছিল। অই কাগজটা তো বন্ধ হইয়া গেছে। তারপরে ভারতের অশোক মিত্র, ইকোনমিস্ট, খুব বড় একজন মানুষ, আমার একটা বই পইড়া, ওখানে ইন্ডিয়ায়ই পড়ছিল। পইড়া একটা অনেক বড় আলোচনা লিখছিলেন দেশ পত্রিকায়। সেটা পড়ে কালি ও কলমে ছেপেছিল নাকি! খেয়াল নাই। হাসনাত। এরকম অনেকের লেখা, তারাপদ রায়ের লেখা ছিল, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা ছিল।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ওপর তো আপনার আলাদা একটা দৃষ্টিভঙ্গি আছে। আপনার সবচেয়ে অন্তরঙ্গ মানুষ।
একসঙ্গে জাপানে গিয়েছিলাম। পনের দিন ছিলাম। খুব আনন্দ হয়েছিল। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, আমি, ভারতের আশীষ স্যানাল আর আমাদের হায়াৎ মামুদ- এই চার জন আমরা গিয়েছিলাম। জাপান বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ সোসাইটির নিমন্ত্রণে। খুব সুন্দর কেটেছে। অনেক স্মৃতি।

আপনার নিজের পছন্দের কবি আছে। এদের মধ্যে কারো কবিতা আপনার ভালো লাগে।
নির্দিষ্ট নাই। কিন্তু এদের দৃষ্টিভঙ্গি, এদের কবিতার নতুনত্ব ভালোই লাগে। একটু অন্যরকম, ভালোই। কবিতা তো এগুবেই। এগুলেই ভালো। সব সময় সব সাহিত্য তো লাফ দিয়ে এগোয় না, ধীরে সুস্থ্যে এগোয়। এখন তো চিন্তা, ভাবনা, ভাষা সবই বদল হচ্ছে। তো ন্যাচারালি তার একটা প্রভাব থাকবে না কবিতায়! কবিতা তো আর আকাশ থেকে আসে না, মানুষের জীবনেরই অংশ। জীবন থেকে উঠে আসে। শিল্প সাহিত্য জীবনেরই অঙ্গাঙ্গি অংশ। আমার জীবন থেকেই তো আমি লিখব। তেমনি, তরুদেরও, তাদের যাপিত জীবন থেকে তারা লিখবেন। তাদের অভিজ্ঞতা, তাদের চিন্তাচেতনার স্তর থেকে। যার যত চেতনার স্তর উন্নত, তার কবিতাও তত উন্নত হবে, সুন্দর হবে। যুগকে তো এড়ানো যায় না। হয়তো ভবিষ্যতের কথা বলা যায়, কিন্তু যুগের ওপর নির্ভর করেই তো বলতে হয়।

আপনি তো মেট্রিকে ১৩ নম্বরের জন্য ফাস্ট ডিবিশন পান নাই। মেধাবী ছাত্র ছিলেন। ওই সময়ে তো ওটা বিরাট ব্যাপার। আপনি কবি হলেন কেন?
না, আমি ঐ অর্থে মেধাবি কখনোই ছিলাম না। পড়েছি বাধ্য হয়ে। ভাই আমাকে জোর করে পড়িয়েছে। আমার তো পড়াশোনর প্রতি কোনো দৃষ্টি ছিল না। আর লেখালেখি তো খুব ছোটকাল থেকে। আট বছর, সাড়ে আট বছর থেকে। ওগুলো হয়তো কবিতা হয় নাই। কবিতা লেখার চেষ্টা করেছি, খাতা ভরে ফেলেছি। আমার ভাই সেইসব খাতা ছিঁড়ে ফেলেছে। পড়াশোনার জন্য মারধর করেছে। আমি যে পড়াশোনা করেছি সে আমার ভাইয়ের জন্য। সে বাধ্য করেছে। যদি করে থাকি পড়াশোনা তো পুরোটাই আমার ভাইয়ের কৃতিত্ব। আমার বড় ভাই আমার পিতাতুল্য। পিতা থাকা সত্ত্বেও, তিনি উদাসীন প্রকৃতির লোক ছিলেন। তিনি আসলে প্রথম জীবনে খুব অ্যাকটিভ ছিলেন। কন্ট্রাকটারি করতেন। কিন্তু তার ঐ দুই সন্তানের মৃত্যুই তার কারণ। তার প্রথম সন্তান, আমার যে বড় বোন, যাকে আমার মান সংস্কৃত পড়েছিলেন কলকাতা পাঠিয়ে। আমাদের এক ফুপা ছিলেন কলকাতায়, তার বাড়িতে রেখে। আমার বোনের নাম ছিল খুকি। ওখানে মুসলমানদের ভর্তি করাত না। ওরা বুঝতে পারে নাই। খুকি নাম দেওয়াতে ওরা মনে করেছে যে হিন্দু। সেখানে আদ্য, মধ্য, অন্ত। অন্ত মানে মাস্টার্স ডিগ্রি। মাস্টার্স ডিগ্রি পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি এসেছে। তখন আমি আমার মায়ের পেটে। সাত মাস না আট মাস। পেটে হাত দিত নাড়াচাড়া করতাম। সে মাকে বলেছিল, মা, ছেলে হলে জীবন রেখো, জীবন কুমার। ওই যে সেই যে কাহিনী আছে না, পুরোনো দিনের- জীবন কুমার একটা রাজ্য উদ্ধার করে। আর মেয়ে হলে আরজুমান। এর পরে তো আমি হওয়ার পরে আমার নাম জীবন। আমি পেটে থাকতে তাঁর কালাজ্বর। তখন ব্লাক ফিভার, ৪৮ ঘণ্টা, কোনো চিকিৎসা ছিল না। ৪৮ ঘণ্টায় মারা যায়। ওই মৃত্যু আমার বাবার মনে প্রচণ্ড দাগ কেটেছে। তারপরে আরেকটা ঘটনা, প্রায় কাছাকাছি সময়ে। আমার ইমিডিয়েট বড় একটা ভাই ছিল। আমার ঠিক বড়। তখন সাড়ে তিন বছর বয়স তার। আমার বোন মারা যাওয়ার পরে, তখনও হই নাই। মা-ও সেই শোক উৎড়ে উঠতে পারে নাই। এই সময় সাড়ে তিন বছর বয়সে বাড়িতে পানসিভর্তি মেহমান এসছে। পানসিতে এটা সেটা নানান রকম আঁকাআঁকি থাকত না! তাকে একটা বাচ্চা মেয়ের কাছে রেখেছিল। সে আর দেখে নাই। ভাইটি ওই পানসি দেখে মুগ্ধ হয়ে উঠতে গিয়েছিল। তারপরে পানসির নিচে পড়ে মারা যায়। এর মধ্যে খবর এসছে, মা দুপুরে রান্না করছে আত্মীয়দের জন্য। মা তখন বলছে, রান্না করছি, এই খবর শুনতে তো তারা আর খাবে না, চলে যাবে। এক কাজ কর, আমাদের শেষ বাড়িতে নিয়া উঠায়া রাখ। খবরদার কেউ কোনো শব্দ করবে না। কোনো রকমে কেউ যেন টের না পায়। তারপর তাদের খাইয়ে দাইয়ে, বিদায় দিয়ে পরে বলছে যত পারিস এখন কান্না কর। এই ছিল আমার মা। (কান্না।) ঐ যে তখন আমি পেটে। তার এত সহিষ্ণুতা। তাকে কবর-টবর দিয়ে…। ওই যে বাবা, সমস্ত কন্ট্রাকটারি, সমস্ত কিছু ত্যাগ করে বাড়িতে আইসা বিছানায় শুয়ে গেলেন। আমার জন্মের পরে তিনি আমাকে কোনোদিন ছুঁয়েও দেখেনি। কোনোদিন কোলে তুলে নাই। তিনি যতদিন জীবিত ছিলেন আমি ওই অবস্থায়ই দেখছি।
আমাদের বাড়ি থেকে সোজা একটা রাস্তা গাঙ পর্যন্ত গেছে। সেটা আধা মাইলের মতো। বিকেলবেলায় ঐ পর্যন্ত হেঁটে যেতেন, ফিরে আবার বিছানায়। এই ছিল তার জীবন। অর্থাৎ শোকে শোকে মানুষ হইছিলাম। ছোটকাল থেকেই জীবনের প্রতি কোনো উৎসাহ আকাক্সক্ষা কোনোটাই ছিল না।

আরেকটু যখন বড় হইলেন, তখন বই পড়া শুরু করলেন।
স্কুল লাইব্রেরির বই সব শেষ করছি। আমাদের মোটামুটি ঐ সময়ে, তখন তো ব্রিটিশ আমল। আমাদের স্কুল ছিল মিডেল ইংলিশ স্কুল। একদম ক্লাস ওয়ান থেকেই ইংরেজি পড়াত। লাইব্রেরিটাও বেশ ভালো ছিল। ওখানে ওই বয়সেই বঙ্কিমচন্দ্রের বইও, পঞ্চম শ্রেণীর মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্রের এই কঠিন বাংলা পড়েছি। দেবী চৌধুরী দিয়ে শুরু করছিলাম, তখন মনে হইছে এট্টু বোধহয় কঠিন হবে। পরে তো সব বই, সিরিয়াস যত বই, সেগুলোও পড়ছি। অর্থাৎ স্কুল লাইব্রেরির বই সমস্ত পড়া শেষ। তখন হেড মাস্টার বলল যে, আশ্চর্য ও তো বই পড়ে শেষ করে ফেলেছে, এখন তো আমাদের চিন্তা করতে হয়, আরো কিছু বই আনতে হয়। পরে তারা কিছু বই, আমার জন্য না, লাইব্রেরির জন্য আনছে।

এই পড়ার প্রতি আপনার আগ্রহটা তৈরি হয়।
ওইখানে তো ক্লাস এইট পর্যন্ত ছিল। এইট পাস করার পরে হাইস্কুলে ভর্তি হই। তখন সাড়ে তিন ঘণ্টার ব্যবধানে দ্ইুটা স্কুল ছিল একটা ঘাটাইলে একটা কালীহাতী। কালীহাতিতে রামগতি শ্রীগোবিন্দ হাইস্কুল নামে একটা স্কুল ছিল। সেখানে ভর্তি হলাম। এখন থাকা। থাকার জন্য এক বাড়িতে চাল ডাল সব দিয়া, মাস পনের টাকা না বিশ টাকা নগদ দিয়ে সে বাড়িতে থাকা। তখন থেকে বাবা একটু দেখতেও যেত। বাপের আদর অনেক দেরি করে পেলাম। পরে তো খুবই। ওনারও অনেক বয়স ছিল তখন। বাবা বাবা ছাড়া কথা নাই। মা-ও তাই।

ওই স্কুলে তো মাইনউদ্দিনের সঙ্গে আপনার পরিচয়।
মাইন আমার বন্ধু। অসাধারণ ছাত্র। ওই সময়েই শেক্সপিয়ার পড়া শেষ। ক্লাস নাইনের ছাত্র। একজন খাঁটি কৃষকের ছেলে। ওই স্কুলের আসার সময় অন্য কোনো বুড়োকে দেখে বলত, আপনি একটু বিশ্রাম নেন, আমি হাল দিয়ে দিই। বোঝানোর উপায় নাই। বিশাল এক আÍজীবনী লিখে আÍহত্যা করে। কী কারণে! ওটা আমি দেখতে পারি নাই। এর আগে আমাকে একটা পোস্টকার্ড দিয়েছিল, বিদায় বন্ধু, আর দেখা হবে না। সেটা ১৯৫৭ সালে।

মৃত্যু সব সময় আপনাকে তাড়িয়ে ফিরেছে।
ওর মৃত্যু আমি এখনও ভুলিনি। আমার প্রথম বই ওকে উৎসর্গ করা।

অসম্ভবের পায়ে বইটা যখন বের হলো তখন বাংলা কবিতার জগতে একটা আলোড়ন তুলল।
জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে কবিতাগুলো লিখেছি। ওই নাম হলো রবীন্দ্রনাথের গান থেকে নেয়া। অসম্ভবের পায়ে, রবীন্দ্রসঙ্গীতের একটা অংশ। আমি মনে করতাম যে, এখনও মনে করি, কবিতা আসলে অসম্ভব ব্যাপার। এটা কোত্থেকে আসে, কীভাবে আসে, কবিতা জোর করে লেখা যায় না। কবিতা ভেতর থেকে আসে। মানুষের জীবন, যে জীবন অনেক দুঃখময়, বা সুখের থেকেও গভীর শোক; শোকের থেকেও হয়। শোকের থেকে যেমনি হয়, তেমনি সুখের থেকেও হয়। প্রধানত শোকের থেকেই হয়। বলতে গেলে, একটা লোক বাইরে হয়তো খুবই উৎফুল্ল, কিন্তু ভেতরে শোকের বাসা। শোকাচ্ছন্ন ভেতরটা। মানুষের বোঝার কোনো উপায় নেই। মানুষ এমন এক অজ্ঞেয় প্রাণী, যাকে বোঝা খুব কঠিন। খুবই খুবই কঠিন। মানুষ কোনো তরল পদার্থ নয়। মানুষের মতো জটিল, মানুষের মতো দরজা বন্ধ করে থাকা; দরজা খুব কম খোলে। খু-ব খু-ব চাহিদার লোক হলে তার সঙ্গে কেবল ভাব আদান-প্রদান করতে পারে। তবে সম্পূর্ণ হয় বলে আমার মনে হয় না। ব্যক্তি অসম্ভব একা। আÍকেন্দ্রিক বললে ভুল হবে। ভুল বলা হয়, ক্ষুদ্র মনে হয়। আÍকেন্দ্রিক হয়তো না। এটা তার, ভেতরটাই এরকম।

যখন প্রথম বইটা বের হলো, তখন আপনি কী করেন?
তখন আমি চাকরি করি। প্রথম বই আমার লেখালেখির বহু পরে বেরিয়েছে। আমার অনেক জুনিয়র নির্মলেন্দু গুণ, পাঁচ বছরের জুনিয়র; তার বই ১৯৬৮ সালে বেরিয়েছে। আমার বই আমার বন্ধু বড় ভাই আসাদ চৌধুরী; আসাদ চৌধুরী আমার দুই বছরের বড়। মানে বয়স একই। আমি ইন্টারমিডিয়েট পড়ি নাই এক বছর। এমন করে পিছিয়েছি। হয়তো এক বছরের বড়ও হতে পারি আমি আসাদের চেয়ে। আসাদ তখন স্কলারশীপ পাইছিল, আমার বই ছাপতে চাইছিল। আমি বললাম, স্কলারশীপের টাকা দিয়ে আমি বই করব না। বই আমার পাবলিশার যদি থাকে তবে হবে। এইজন্যই স্বাধীনতার পরে আমার বই বের হয়। আমি অধ্যাপনা করেছি। কাকমারী কলেজে অধ্যাপনা করতে করতে মুক্তিযুদ্ধে গেছি।

একটা বিষয়ে আমি খুবই অবাক হয়েছি। যখন আমি টাঙ্গাইল মুক্তিবাহিনীর প্রধান শহীদ সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি, একটা ছবি আমি পাইছি, এক মুক্তিযোদ্ধার জানাজা। যার নাম নাই। আপনি, তখন লম্বা চুল কাদের সিদ্দিকী, তার পাশে আপনি, পাশে আরো কে কে আছেন।
ওই সময় আমরা ছাত্রদের ট্রেনিং পর্যন্ত দিয়েছি কাঠের বন্দুক দিয়া। তারপর খুব অনিবার্য হলে গেল তখন চলে গেলাম ভেতরে। টাঙ্গাইলে একটা ঘন জঙ্গল ছিল। ওইখানে আমাদের কমাণ্ডার ছিলেন অসম্ভব অসাধারণ মানুষ কাদের সিদ্দিকী। মুক্তিযুদ্ধে অনেক বড় বড় সৈনিক ছিল তো, ওদের চেয়ে আমি মনে করি যুদ্ধ উনি অনেক ভালো জানতেন। তুলনাহীন। এখন রাজনীতি করতে এসে তাকে আওয়ামী লীগ সহ্য করতে পারেনি বলে, ওই শেখ হাসিনার আসেপাশে কুত্তার বাচ্চারা, কাদের সিদ্দিকীরে টিকতে দেয় না। এইজন্য যে, ওনাকে বুঝাইছে, যে আপনাকে দখল কইরা ও-ই হবে। ওটা মিধ্যে কথা। ও বোন ছাড়া কিছু বলে নাই, বঙ্গবন্ধুরে বাপ ছাড়া কিছু বলে নাই।
আমাদের ইপিআরের লোক ছিল। যারা ট্রেনিং দিয়া আমাদের তৈরি করেছে। আমাদের ভারত যাইতে হয় নাই। কাদের সিদ্দিকীর ট্রেনিং আর ইপিআর যারা ছিল। এক গাঁদা ইপিআরেরে তিনি তৈরি করেছিলেন। আঠার হাজার ছিল অধীনে, সক্রিয়, সশস্ত্র। ওই জায়গাটা একটা বিখ্যাত জায়গা। নামটা মনে করতে পারছি না। বলছি না আমি স্মৃতি হারাইয়া ফেলছি। আশেপাশে সমস্ত গ্রামে ছড়ানো ছিল আমাদের ছেলেরা। প্রতিটি বাড়িতে, বাড়ির লোকগুলো তারা খাওয়াছে পরাইছে। বিরাট ব্যাপার। ভাবা যায় না। গোটা দেশ তখন মুক্তিযুদ্ধে। এগার তারিখে গোটা টাঙ্গাইল মুক্ত কইরা ফেলছি। কোথায় ষোল তারিখে আর কোথায় এগার তারিখে। গোটাটা আমাদের হাতে।

একটা অবিস্মরণীয় স্মৃতি আছে আপনার বিরিশিরিতে। ওটা আপনার জীবনে একটা সুন্দর সময়। এরকমও শুনেছি গারোদের দুইটা গ্র“প আপনার জন্য মারামারি করত না।
গারো হাজং ওরা সহ্য করতে পারত না। কিন্তু আমি যাওয়ার পর, প্রথমে তারা আমাকে এক্সসেপ্ট করে নাই। আবার বাঙালি! আমি গিয়া প্রথমে যেডা করলাম, ওদের একটা বিশাল তিন বিঘার মইধ্যে, সেখানে মুসলমানরা মেলা করত। পহেলা বৈশাখের মেলা। আমি প্রথমে গিয়া বলছি, এই জায়গায় তোমরা মেলা করতে পারবা না। এটা সামান্য একটু জায়গা এদের। তোমরা স্কুলের মাঠে বিরাট জায়গা আছে, সেখানে করো। এখানে আমি কাউকে ঢুকতে দেব না। আমি গোটাটা ওয়াল দিয়ে ফেললাম। এবার ওরা লক্ষ্য করলো। আমি বললাম, মাত্র এতটুক জায়গা হলো গারো আর হাজংদের। এইখানে কোনো লোক ঢুকতে গেলে আমার পারমিশন নিয়ে ঢুকতে হবে।

আমি কোনো বাঙালি না, আমি আজকে থেকে গারো হাজং। ব্যস, সবাই ভক্ত হয়ে গেল। সবাই বাবা বলত। তারপর আমি সরকারের সঙ্গে কথা বললাম যে, এই জায়গাটা একটু কাজে লাগানো দরকার। ওখানে একটা পুকুর কাটাইলাম বড়। এক বিঘার ওপরে। ওই মাটি অন্য অংশে ফেলে ওখানে খুব তাড়াতাড়ি বাড়ে এইরকম গাছ, বিশেষ করে সেগুন, এগুলো লাগিয়ে দিলাম।

আর পুকুরের চারদিক দিয়ে নারিকেল গাছ, সুপারি গাছ দিয়ে ভরে ফেললাম। আর পুকুরটায় মাছ ছেড়ে দিলাম। ওদের বললাম যে তোমরা একটা সমিতি করো। এই সমিতি এই পুকুরটা চালাবে। তোমাদের সম্পদ হবে এইটা। তোমরা মাছ এনে ছাড়বা, তোমরা বিক্রি করবা। কারণ ওদের তখন বেতন এত কম, আমি ছয় বছরে ওদের বেতন বাড়াইছি ছয় বার। একটা সুবিধা ছিল, অর্থ মন্ত্রণালয়ে কেউ না কেউ আমার পরিচিত ছিল। আমি ওদের বলতাম, যে ভাই, গরীব মানুষ, গারো হাজং, এদের দিকে দৃষ্টি দিতে অসুবিধা কোথায়। তখন যে থাকত বলত, দেখেন এরম করে কথা কেউ বলে না। বলত, উনি তো নিজের জন্য কিছু করে নাই। এইবার দিয়া দিই। পারমিশন হয়ে যেত। পরে যখন ওখানে আমার সময় শেষ হলো, তখন আমাকে দিল জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে।

চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া যে কবিতা, সেখানে বিদ্রোহের কথা আছে। এটা কোন জায়গায়?
ওটা হলো টাঙ্গাইলের মধুপুরে গভীর জঙ্গলে। মানে টাঙ্গাইল ময়মনসিংহ রোডের এগার মাইল ভেতরে গভীর জঙ্গলে। ওই কবিতাটা বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পরে করা। ১৯৭৬ সালের লেখা। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পরে আমরা বেশ কয়েকজন বন্ধু, প্রত্যেক পূর্ণিমাতে ওই জঙ্গলে যেতাম। শ্রীপুর ফরেস্ট বাংলো গেছি, চুনিয়া গেছি। চুনিয়া গিয়া জায়গাটা এত পছন্দ হলো, ওই চুনিয়াতে আমরা চার পাঁচবার গেছি। যারা যারা গেছে, প্রত্যেকেরই চুনিয়ার ওপর লেখার কথা ছিল। কেউ লিখে নাই, একমাত্র আমি লিখছি। সেখানে শামসুজ্জামান খান, হাবিবুল্লাহ সিরাজী, রশিদ হায়দার আরো কারা কারা ছিল।

বঙ্গবন্ধুর কথা যখন এলোই, আপনার সেই বিখ্যাত কবিতা ‘ভাত দে হারামজাদা’ এটা নিয়েও তো ঘটনা আছে।
আসলে এটা একটা ভুল ছিল। এখনও তো আওয়ামী লীগের প্রচারাদি নাই। এত কাজ করছে শেখ হাসিনায়। প্রচার কই! বঙ্গবন্ধুর ওই সময়ে ওই রংপুরে সবসময়ই তিন মাস খ্যাদাভাব ছিল। সেইটাকে কাজে লাগাইছে বঙ্গবন্ধুর বিরোধীরা। পাকিস্তান যে হারছে, ওই হারা পাকিস্তানের পক্ষে ছিলে অনেক…। তারা সমানে ওই জায়গাটা নিয়া পত্রপত্রিকায় লিখছে। আমরা এত বোকা ছিলাম যে, একটা মেয়েলোক জাল পইরা সম্ভ্রম রক্ষা করতে পারে! মাছ তোলার জাল, সেইটায় কি সম্ভ্রম রক্ষা সম্ভব! আমরা বুঝি নাই। আমিও বুঝি নাই। ইত্তেফাকের একজন ওই ছবিটা তুলছিল। রাজিব না কি নাম! শালা মারাও গেছে। শালা মারা যাওয়ার আগে বলছে যে, আমার কাজ হইলো ছবি তোলা বিখ্যাত হওয়া। ও বিখ্যাত হইছে। জাল পরে সম্ভ্রব রক্ষা করা সম্ভব! সবই তো দেখা যাবে। সে কি করছে রংপুর স্টেশনে একটা লোক বদহজমের কারণে বমি করছে। সে এক বুভুক্ষু লোককে ধইরা আইন্যা কইছে, তোরে একশ ট্যাকা দিমু, তুই খালি ভঙ্গি করবি যে তুই এইটা খাইতাছস। এইটা ওই কুত্তার বাচ্চা ফটোগ্রাফার পরে স্বীকার করছে। ওই ছবি তুইল্যা দিল। ওইটা দেইখ্যা আমি কবিতা লিখছি।
এইটা দেইখ্যা আমার সহ্য হয় নাই যে কীসের স্বাধীনতা!

পরে তো এমন একটা অবস্থা সৃষ্টি হলো যে আপনাকে জেলে নেওয়ার একটা চিন্তা চলছিল।
বঙ্গবন্ধুর ভেতরে বাইরে তার বিরোধী লোকে ভর্তি ছিল। আর দেশে পাকিস্তান তো পাগল হইয়া গিয়া তার যত লোক খুঁইজ্যা বাইর করছে টাকা পয়সা দিয়া। আর বঙ্গবন্ধুর মতো লোক বলে আমিও বাঁচ্চি। ওরা তো নিজেরা স্বপ্রণোদিত হইয়া অ্যারেস্ট অর্ডার বের কইরা ফেলছিল। কিন্তু আমার কমান্ডার আর সেকেন্ড-ইন-কমান্ড আনোয়ার হোসেন/ আনোয়ারুল হক শহীদ এই দুই জনে মিল্যা আমারে বঙ্গবন্ধুর কাছে নিয়া গেছে যে এর কথা শোনেন। তখন রক্ষী বাহিনীর সেকেন্ড-ইন-কমান্ড ছিল আনোয়ারুল শহীদ। পরে আমি বলছি যে এই ঘটনা। তখন উনি টেলিফোন করে দিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে। ক্যাম্পেন মনসুর আলীর কাছে আমারে পাঠাইলো যে, উহাকে পাঠাইলাম, যে গাড়িতে যাচ্ছে ওই গাড়িতে ফেরত দিবা। তো গাড়িতে গেলাম। উনি আমারে দেইখ্যা বললেন যে, বয়স কম, এখন তো এসবি করবি। এগুলা করলে সোজা আমার বাসায় চইলা আসবি। তখন ডিআইজিকে টেলিফোন কইরা দিল। এসবির যে অফিস। ঐখানে গেলাম। ওই তো আমারে আটকাইয়া রাইখ্যা বলল যে, কেন লিখছেন, কী, হেইডার ব্যাখ্যা লেখেন। একদিস্তা কাগজ দিল আর দুই কাপ চা। বলল, চা খান আর লেখেন। ৬১ পৃষ্ঠা লিখছি। সারা পৃথিবীর যে খাদ্যাভাব, কোথায় কোথায় খাদ্যাভাব নাই, আছে, কোথায় কোথায় মানুষ মারা যাচ্ছে না খাইয়া, এগুলা তো কিছুই না। বললাম, আমি যা লিখছি ঠিক লিখছি। এইসব ইতিহাস পড়ার পরে যা দাঁড়ায়ম, এইটাও তাই। একটা মানুষও মারা যেতে পারে না। দেশ স্বাধীন হইছে, বঙ্গবন্ধুর উচিত ছিল এইডা দেখা। পরে আমারে কয় যে, যাও যাও।

আপনার সম্প্রতি আরেকটা বই, মৌলভীর মন ভালো নেই।
মৌলভীরা ঝামেলা করে, এই করে সেই করে। আমি অন্যভাবে মৌলভীরে দেখেছি। আমি যখন হাঁটি তখন একটা মৌলভীও হাঁটে, দৌড়ায়। তার মানে মৌলভীও বাঁচতে চায়। এক মৌলভীর কথা লিখছি যে সে বিদেশে গেছিল, গিয়া তাড়াতাড়ি আইয়া পড়ছে এর বান্ধবীর জন্য। মৌলভীরও মন ভালো নাই প্রেমিকার জন্য। মৌলভীর খালি আল্লাহ না, প্রেমিকাও আছে।

আপনার তো প্রেমের কবিতা অনেক বিখ্যাত। আবৃত্তিতে অনেক শোনা যায়।
প্রেমের কবিতা ছাড়া আর কবিতা আছে নাকি। সব কবিতাই প্রেমের কবিতা। প্রেম একটা শ্বাশত জিনিস।

আপনার ‘কোনো খেদ নেই’ বইটাতে শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এদের সম্পর্কে একটা মূল্যায়ন আছে। বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত কবিরা আপনার বন্ধু, তাদের সঙ্গে আপনার সময় কেটেছে।
শক্তিকে নিয়া কুচবিহারে আমরা কী উম্মত্ত আড্ডা দিছি। সুনীল দা অত উন্মত্ত হইতো না, আমি আর শক্তি যে রবম হইয়া যাইতাম। সুনীল দা অসম্ভব শক্ত ছিল। কখনো মাতাল হইতে দেখি নাই। খালি জাপানে দেখলাম, একটু ক্লান্তি লাগছে আধা ঘণ্টা পরে আমি আসতাছি। বলে একটু ঝিমাইতে গেল। সারা রাত আড্ডা। জাপানটা খুব সুন্দর দেশ। এই জাপানে আমি প্রথম গোঁফ কাইট্যা ফেলাইলাম। যেখানে তাকাই কারো গোঁফ নাই। কী ব্যাপার, কী ব্যাপার, কারো গোঁফ নাই কেন! পরে একজন জাপানিজের সঙ্গে পরিচয় হইল। বললাম, ভাই, তোরা গোঁফ রাখিস না কেন? বলল, এইখানে এক মগা ছাড়া আর কেউ গোঁফ রাখে না। আমি মধ্য রাইত, রাইত আড়াইটা সময় গোঁফ ফালাইয়া দিলাম। পরের দিন সুনীল দা দেইখ্যা অবাক হইয়া গেল। তারপর সে এই কাহিনীও লিখছিল। কোন বইতে জানি আছে- এরপরে রফিকের মনটা খুব বিমর্ষ। শেষদিকে তাঁর একটা ভ্রমণকাহিনী বের হইছে।

আপনি কী এখন লেখালেখি এখন করেন?
না।

আপনি বাংলা সাহিত্যের একজন বিখ্যাত কবি। আপনার প্রিয় কবি কে?
আমার প্রিয় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এখন আরো প্রিয়। কেন যেন। রবীন্দ্রনাথ ছাড়া বাঁচতেই পারি না। আর বিশেষ করে গান, রবীন্দ্রনাথের গান এত্ত অর্থময় আর আশ্রয়। আমার এখনকার আশ্রয় রবীন্দ্রনাথ।

আপনি গদ্য লিখলেন না কেন? গদ্য লিখতে গেলে জ্বর আসে, এই কথা একবার লেখছেনও।
কী গদ্য লিখব! গল্প উপন্যাস আমি পছন্দ করি না। পড়ি, মানে কি, পড়েছি। মানিক পর্যন্ত। আর আমি যখন সম্পাদক ছিলাম, উত্তরাধিকারে, রোববারে। মিলনকে আমার খুব ভালো লাগে। ওর কিছু কিছু লেখা খুব ভালো। তার সঙ্গে আমার প্রায় পিতাপুত্রের সম্পর্ক। ওর প্রথম উপন্যাস যাবজ্জীবন। ওটা প্রথমে চাইছিলাম গল্প। দিছিল গল্প হিসেবে। পরে পইড়া দেখলাম যে এটা আরো বিস্তৃত করার সুযোগ আছে। তখন ওরে বলছিলাম, এইখানে শেষ কইরো না, থেমো না। কলম টেনে যদ্দূর নিয়া যায় যাক, তুমি নিজের থাইক্যা থামাই দিও না। এই করতে করতে ঐ যে ছোট একটা উপন্যাস। আপনাকে ধন্যবাদ
তোমাকেও

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>